ইরানের যুদ্ধে আপাতত সরাসরি জড়াচ্ছে না হুথিরা
ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন আপাতত ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল উত্তেজনায় সরাসরি সামরিকভাবে জড়াতে দ্বিধায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় তার ওপর নির্ভর করবে তাদের অংশগ্রহণের সময় ও মাত্রা।
বুধবার (৪ মার্চ) আরবভিত্তিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষকদের ধারণা, যদি হুথিরা মনে করে যে তাদের প্রধান মিত্র ইরান বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বা অস্তিত্বের হুমকির মুখে রয়েছে, তাহলে তারা সামরিকভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
আদেনভিত্তিক পত্রিকা আদেন আল-গাদ–এর সম্পাদক ফাতেহি বিন লাজরেক বলেন, হুথিরা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইরানের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। যদি তারা মনে করে ইরানি শাসনব্যবস্থা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তাহলে তারা পুরোপুরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি প্রথম ভাষণে তুলনামূলক সংযত সুরে কথা বলেন। তিনি তেহরানের প্রতি সমর্থন জানালেও সরাসরি সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেননি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যার ঘোষণার পর তিনি আরেকটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন, যেখানে ইরানি জনগণের প্রতি সমবেদনা জানান। তবে সেখানেও সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেননি।
হুথিরা নিজেদেরকে প্রায়ই ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত ইরানঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক জোটের অংশ হিসেবে দেখে। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের আগে সিরিয়াও এই জোটের অংশ ছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই হুথিদের ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র বা প্রক্সি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক পরামর্শসহ বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে তেহরান হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে হুথিদের অস্ত্র সরবরাহও বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা তাদের জন্য বড় কৌশলগত ক্ষতি হবে।
লাজরেক বলেন, হুথিরা মনে করে, ইরানি শাসনব্যবস্থা পতন হলে তারা দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ তাদের শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস—ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহবন্ধ হয়ে যাবে।
অভ্যন্তরীণ মতভেদ
তবে এবার সংঘাতের শুরুতে হুথিদের প্রতিক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক।
২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় যুদ্ধ শুরু হলে হুথিরা দ্রুত লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করেছিল এবং পরে ইসরায়েলের দিকেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
কিন্তু এবার তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সংযত।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের পর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস দুটি হুথি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, তারা আবার লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করবে। তবে পরে হুথি কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই দাবি অস্বীকার করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সংগঠনের ভেতরের মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়।
ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালেহ আল-বাইদানি বলেন, আন্দোলনের ভেতরে এ নিয়ে তীব্র মতভেদ রয়েছে। তাঁর মতে, সংগঠনের কঠোরপন্থীরা ইরানের সমর্থনে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাপ দিচ্ছেন, আর অন্য একটি অংশ সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে।
হিসেব করে উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা এখন পরিস্থিতি খুব হিসেব করে এগোচ্ছে, যাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া না আসে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, হুথিরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় না যাতে মনে হয় তারা কেবল ইরানের স্বার্থে যুদ্ধ করছে, ইয়েমেনের স্বার্থে নয়।
তিনি বলেন, সংগঠনটি যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে তা সম্ভবত “আত্মরক্ষার” ভাষায় ব্যাখ্যা করা হবে, ইরানের প্রতি সরাসরি সমর্থন হিসেবে নয়।
একই সময়ে হুথিরা আশঙ্কা করছে, বড় ধরনের পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পাল্টা হামলা চালাতে পারে।
গত বছরের আগস্টে ইসরায়েলি এক হামলায় হুথি প্রশাসনের প্রধানমন্ত্রী ও কয়েকজন মন্ত্রী নিহত হন। এছাড়া ইয়েমেনের বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর হোদেইদা, তেল সংরক্ষণাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিমেন্ট কারখানাতেও হামলা হয়েছিল।
মুসলিমি বলেন, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের হামলায় হুথিদের সামরিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে নতুন সংঘাতে জড়ানো তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধের মধ্যে থাকা হুথিরা হঠাৎ করেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
মুসলিমি বলেন, যদি হুথিরা সরাসরি হামলার শিকার হয় বা ইরান ও হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ কোনো গোষ্ঠী তাদের পক্ষে সংঘাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তারা দ্রুত যুদ্ধের ময়দানে নামতে পারে।
তিনি বলেন, হুথিরা ঝুঁকি এড়িয়ে চলার জন্য পরিচিত নয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের পরিবেশে কাজ করতে অভ্যস্ত এবং অনেক সময় সংঘাতকে ব্যবহার করেছে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমর্থন ও আদর্শিক ঐক্য জোরদার করতে।

